Jonotar News Desk  |  ই-পেপার  |  প্রিন্ট প্রকাশিত সময়: ০৬-১১-২০২৬, ০৫:৪১ পূর্বাহ্ণ  |  প্রকাশের তারিখ: Oct ৪, ২০২৬

বিমানবন্দরে যাত্রী ভোগান্তি থেকে মামলা-রিমান্ড: আখতারুজ্জামানকে ঘিরে যা ঘটেছিল

বিমানবন্দরে যাত্রী ভোগান্তি থেকে মামলা-রিমান্ড: আখতারুজ্জামানকে ঘিরে যা ঘটেছিল
বিমানবন্দরে যাত্রী ভোগান্তি থেকে মামলা-রিমান্ড: আখতারুজ্জামানকে ঘিরে যা ঘটেছিল
স্টাফ রিপোর্টার
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ, ট্রলি ও জমজমের পানি পেতে বিলম্বকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করে এক দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

ঘটনার শুরু ১ অক্টোবর সকালে। মদিনা থেকে বাংলাদেশ বিমানের BG-338 ফ্লাইটে ৩৪ জন জামায়াত প্রতিনিধি সপরিবারে ঢাকায় আসেন। বিমানবন্দরে ওই সময় আগমনী যাত্রীর বাড়তি চাপ থাকায় ট্রলি সংগ্রহে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। পরে লাগেজ ও জমজমের পানি পেতে বিলম্ব নিয়ে কয়েকজন যাত্রীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, কয়েকজন প্রটোকল সহকারী ট্রলি সংগ্রহের লাইনের নিয়ম ভেঙে ট্রলি নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে লাগেজ ও জমজমের পানি পেতে দেরি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কয়েকজন উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং বিমানবন্দরকর্মীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সকাল পৌনে ১১টার দিকে ঢাকা-৫ আসনের এমপি মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে ঘটনাস্থলে ডাকেন।

নির্বাহী পরিচালক সেখানে গিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলার সময় আখতারুজ্জামানের সঙ্গে তাঁর উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
ভিডিওতে যা দেখা ও শোনা যায়

ঘটনার একটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে আখতারুজ্জামানকে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক রাগীব সামাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে উত্তেজিত অবস্থায় কথা বলতে দেখা যায়।

ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়—
“ঘাড় ধরে বের করে দেব, ঘাড় ধরে বের করে দেব। আপনারা কাজ করেন না, কিছু করেন না, তদবির করে পোস্ট নেন। মাইর খাইতে চান?”

এজাহারে ভিডিওতে শোনা বক্তব্যের পাশাপাশি আরও কিছু বক্তব্যের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে আখতারুজ্জামানকে “আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা”, “গেট আউট ফ্রম হিয়ার” এবং “কাজ জানেন না, তদবির করে পোস্টিং এ আসবেন” বলার অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে প্রকাশ্যে আসা ভিডিওটি পুরো ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধারণ করা কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। ফলে ভিডিওতে দৃশ্যমান অংশ এবং এজাহারে বর্ণিত অভিযোগকে আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন।

এজাহারে বলা হয়েছে, আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা কয়েকজন প্রটোকল সহকারী বিমানবন্দরের কেপিআই এলাকায় ঘটনার ভিডিও ধারণ করছিলেন।
নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন সেখানে ভিডিও ধারণে নিষেধ করলে আখতারুজ্জামান তাঁর কাছে গিয়ে গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে মামলার এজাহারেই বলা হয়েছে, কথিত মারধরের স্থানটি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় ছিল না। এ কারণে ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের মাধ্যমে বিষয়টি প্রমাণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক প্রতিনিধির সঙ্গে অশোভন ও মারমুখী আচরণ এবং সাধারণ যাত্রীদের জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলার অভিযোগও এজাহারে রয়েছে।

অন্যদিকে আখতারুজ্জামানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিনি বিমানবন্দরে যাত্রীদের ভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ করছিলেন।
আদালতে তাঁর আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আখতারুজ্জামান ১৬ দিনে আটটি বিমানবন্দর ব্যবহার করেছেন এবং শাহজালাল বিমানবন্দরের মতো অনিয়ম অন্য কোথাও দেখেননি বলে আদালতে জানিয়েছেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, লাগেজ ও জমজমের পানি নিয়ে যাত্রীদের ভোগান্তির কারণেই তিনি প্রতিবাদ করেন। তাঁর পক্ষ থেকে নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে মারধরের অভিযোগও অস্বীকার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারের আগে দেওয়া ভিডিওবার্তাতেও আখতারুজ্জামান জনগণ ও প্রবাসীদের স্বার্থে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন।

বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ ঘটনার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত মন্তব্য করেননি।

তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত তথ্যও উঠে এসেছে। বিশেষ করে জমজমের পানি সময়মতো পৌঁছাতে কন্টেইনার অফলোডিং ও পরিচালনাগত গাফিলতির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ যাত্রীদের অভিযোগের অন্তত একটি অংশ—জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্ব—সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ছিল বলে বলা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত শুক্রবার রাতে শাহজালাল বিমানবন্দর পরিদর্শন করে ঘটনাটিকে “মব ও ইচ্ছাকৃত বিশৃঙ্খলা” বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, হজ বা ওমরাহ শেষে দেশে ফিরে কিছুটা ধৈর্য ধরার প্রয়োজন ছিল।

মন্ত্রী আরও বলেন, বিমানবন্দরে ট্রলি আনার ক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগতে পারে; তবে কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয় বলে তাঁর বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়।
মামলা ও গ্রেপ্তার
ঘটনার পর বিমানবন্দর নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজীব বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন।

মামলায় আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে হুমকি এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাজেদুল ইসলামকে ১০ নভেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

২ অক্টোবর সন্ধ্যায় ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে ডিবি পুলিশ আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে।

আদালতে পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়েছিল পুলিশ
৩ অক্টোবর আখতারুজ্জামানকে আদালতে হাজির করে পুলিশ পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করে।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিমানবন্দরের ঘটনার পেছনে কোনো মহলের ইন্ধন ছিল কি না এবং ঘটনার মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না—এসব বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
আখতারুজ্জামানের আইনজীবী রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত পুলিশের পাঁচ দিনের আবেদন নাকচ করে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

৩ অক্টোবর আদালতে নেওয়ার সময় পুলিশের দেওয়া হেলমেট নিয়ে আখতারুজ্জামানের সঙ্গে পুলিশের কথা কাটাকাটি হয়। পরে তিনি হেলমেটটি ছুড়ে ফেলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। ঘটনাটির ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এটি বিমানবন্দরকেন্দ্রিক মূল মামলার অভিযোগের বাইরে আলাদা একটি ঘটনাক্রম হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত যা নিশ্চিত, আর যা অভিযোগ
ঘটনাটির ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি।
নিশ্চিতভাবে প্রকাশ্যে এসেছে:

১ অক্টোবর বিমানবন্দরে যাত্রী ভোগান্তি নিয়ে উত্তেজনা হয়; আখতারুজ্জামান ও বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকের উত্তপ্ত কথোপকথনের ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে; পরে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়; তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আদালত এক দিনের রিমান্ড দেন।

মামলার অভিযোগ:
নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা, জমজমের পানির বোতল ছোড়া, বিমানকর্মীর সঙ্গে মারমুখী আচরণ এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ।
আখতারুজ্জামানের পক্ষের বক্তব্য:
তিনি যাত্রীদের ভোগান্তি ও বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে করা শারীরিক লাঞ্ছনার অভিযোগ সঠিক নয়।
ফলে নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে মারধরসহ এজাহারের অভিযোগগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত অপরাধ নয়; এগুলো তদন্তাধীন অভিযোগ।
সামনে কী?

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। তদন্তে ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

অন্যদিকে ঘটনাটি নতুন করে বিমানবন্দরের ট্রলি ব্যবস্থাপনা, লাগেজ সরবরাহ ও ওমরাহযাত্রীদের জমজমের পানি বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
সব মিলিয়ে, শাহজালাল বিমানবন্দরের এই ঘটনা এখন দুটি সমান্তরাল প্রশ্ন সামনে এনেছে

—যাত্রীসেবায় সত্যিই কী ধরনের ঘাটতি ছিল এবং সেই ঘাটতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে আইন ও শৃঙ্খলার সীমা অতিক্রম করা হয়েছিল কি না। প্রথমটির প্রশাসনিক তদন্ত এবং দ্বিতীয়টির বিচারিক তদন্ত—দুটির ফলই সামনে এলে ঘটনার পূর্ণ চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।

জনতার নিউজ ডেস্ক — বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে অঙ্গীকারবদ্ধ।