রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার কথা থাকা পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়ামের একটি চালান নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে পারেনি। পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় ২৪ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত ফ্লাইটটি স্থগিত হয়ে যায়।
প্রাথমিকভাবে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার জন্য নির্ধারিত রুটে কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের আকাশসীমা ব্যবহারের কথা ছিল। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়ায় ফ্লাইটটি নির্ধারিত সময়ে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছিলেন, ২৪ সেপ্টেম্বর ইউরেনিয়ামবাহী কার্গো বিমানটি বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় সেটি আসতে পারেনি। সে সময় পাকিস্তান কেন অনুমতি দেয়নি, তার সুনির্দিষ্ট কারণ বাংলাদেশের কাছে জানা ছিল না।
তবে ৩০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান এ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাজ্জাদ হায়দারের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং ফ্লাইট রুট, আকাশসীমার অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষগুলোর সমন্বয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত কারিগরি ও পদ্ধতিগত বিষয়। পাকিস্তানের দাবি, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী কূটনৈতিক ফ্লাইট ও ওভারফ্লাইটের আবেদন যাচাই করা হয় এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের কারণে কখনো ফ্লাইটের সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে।
পাকিস্তান আরও বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে তারা গুরুত্ব দেয়। তাই ঘটনাটিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে এর কারিগরি প্রেক্ষাপটে দেখার আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
এদিকে রূপপুরের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রসাটম জানিয়েছে, দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে এবং বছরের শেষ নাগাদ সরবরাহ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। জ্বালানি কয়েকটি ফ্লাইটে পাঠানো হবে।
বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের আকাশসীমা-সংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে বিকল্প রুটে ১ অক্টোবর থেকেই নতুন চালান আসার কথা রয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরবর্তী চালানগুলো বিকল্প রুটে আসবে এবং বাকি জ্বালানি ডিসেম্বরের মধ্যে কয়েকটি কার্গো ফ্লাইটে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
৩০ সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে চীনের আকাশসীমা ব্যবহার করে ইউরেনিয়াম আনার সম্ভাব্য রুটের কথাও প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাশিয়া থেকে কয়েকটি উড়োজাহাজে চালান আসতে পারে এবং পাকিস্তানের পরিবর্তে চীনের আকাশসীমা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি VVER-1200 ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট; দুটি ইউনিট মিলিয়ে কেন্দ্রটির মোট ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটের পারমাণবিক জ্বালানি ২০২৩ সালে বাংলাদেশে পৌঁছেছিল।
তবে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহে এই বিলম্বকে কেন্দ্র করে রূপপুর প্রকল্পের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়সূচি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সময়ে প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদনও এখনো শুরু হয়নি এবং প্রকল্পের কিছু কারিগরি জটিলতা নিয়ে কাজ চলছে।
সুতরাং, “ইউরেনিয়াম পাকিস্তানের আকাশে আটকে গেছে”—এভাবে বলা পুরোপুরি সঠিক নয়। নির্ভুল তথ্য হলো, পাকিস্তানের আকাশসীমার ওভারফ্লাইট অনুমতি না পাওয়ায় নির্ধারিত ফ্লাইটটি স্থগিত হয়েছিল। পাকিস্তান এটিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, কারিগরি ও পদ্ধতিগত বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। এখন বিকল্প রুটে অক্টোবর থেকে জ্বালানি সরবরাহ পুনরায় শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্তব্য করুন